যেভাবে আপনার চঞ্চল বাচ্চাকে ঘরের টুকিটাকি কাজ করায় অভ্যস্ত করবেন

সাধারণত ১ থেকে ৩ বছরের শিশুদের Toddler বলা হয়। Toddler থেকে ৬/৭ বছরের শিশুরা সাধারনত একটু বেশী চঞ্চল হয় আর তারা সবধরনের কাজ আগ বাড়িয়ে নিজে নিজে করতে চায়। তারা সবকিছুতে স্বাধীনতা চায়। বাবা-মা যেভাবে যা যা করে তারাও সেগুলো করতে চায়। এটা তার বয়সের জন্য খুবই স্বাভাবিক। বাবা-মা, শিক্ষকরা কিন্তু এইক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এই বয়সে যদি আপনি তাকে ঘরের কাজ বা Chores করায় অভ্যস্ত করতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে আপনি তার দায়িত্ববোধের ব্যাপারটাও হয়তো নিশ্চিত করতে পারবেন। এতে সে স্বাবলম্বী হয়ে বেড়ে উঠতে শিখবে।

Parenting Mindset:

আপনার কাছে যে কাজটা সহজ, সে কাজটাই কিন্তু আপনার বাচ্চার কাছে জটিল আর কঠিন। এই কাজগুলো করেই সে তার স্বাবলম্বিতা জাহির করতে চায়। তারা সবকিছুই নতুন নতুন শিখছে। তাই, আপনার বাচ্চা যেকাজ করবে তা নির্ভুল আর নিখুঁত হতে হবে- এই মনোভাব ঝেড়ে ফেলুন।

ঘরের টুকিটাকি কাজগুলো করানোর গুরুত্বটা হল, বাচ্চাকে নিজের কাজ নিজে করতে অভ্যস্ত করানো।কাজ নিখুঁত হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ না। সময়ের সাথে সাথে সে এমনই ঠিকঠাকভাবে সবকিছু করা শিখে যাবে।

ধরুন, আপনি যতভালো আর যত তাড়াতাড়ি বিছানা গোছাতে পারবেন ততো ভালোভাবে আপনার বাচ্চা পারবে না। কিন্তু তাই বলে তার বিছানা আপনি গুছিয়ে দেবেন না। যদি গুছিয়ে দেন তাহলে সে মনে করবে, সে কাজটা ঠিকভাবে করতে পারে না বা আপনার তার কাজ পছন্দ হয় নি। এটা একসময় তার মনে হতাশা এবং ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। আপনার লক্ষ্য হবে তাকে উৎসাহিত করা, যাতে সে ধীরে ধীরে আরো ভালো করে এবং কঠিন কাজগুলো করার উৎসাহ পায়। নিজের কাজ নিজে করাটা গুরুত্বপূর্ণ, আপনি করে দিলে সে কিছু শিখবে না।

 

কাজ করাকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করাঃ

রুটিন অনুযায়ী, যেমন- সকাল, বিকাল, সন্ধ্যায় ঘরের কাজগুলো করলে আপনার বাচ্চা কাজের ধারাবাহিকতা বুঝতে পারবে। এটা অনেকটা দৈনন্দিন জীবনে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং আস্তে আস্তে নিজেকে এর জন্য প্রস্তুত করার মতো।

বিছানা গোছানোর কাজটি দিয়েই এখানে উদাহারণ দেওয়া যায়। আপনি ২টি পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন,

  • ১। তার কাজগুলোর একটা রুটিন বানিয়ে ফেলা। যেমন- সকালে ঘুম থেকে উঠার পর ও রাতে শোওয়ার আগে বিছানা গোছানো।
  • ২। আপনার নিজেরও সে রুটিন অনুসরণ করা, যাতে আপনার বাচ্চা আপনাকে মডেল হিসেবে আপনার কাছ থেকে শিখতে পারে।

ভেবে দেখুন, আপনার সন্তান কিন্তু আপনাকে অনুকরণ করতে ভালবাসে- আপনি এই ব্যাপারটির সুবিধা নিন। আপনার শিশু আপনাকে বিছানা গোছাতে দেখলে, সেও আপনার মতো করে বিছানা গোছাতে চাইবে।

 

যে কাজ গুলো আপনার বাচ্চা করতে পারবেঃ

বয়স ২-৩ বছর

  • খেলনা গুছিয়ে রাখা
  • কোথাও খাবার পড়লে তা মুছে ফেলা বা তোলা
  • নিজের চুল আঁচড়ানো
  • সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
  • খাওয়ার পর নিজের প্লেট, চামচ ঠিক করা
  • আস্তে আস্তে নিজে খেতে শিখা
  • গাছে পানি দেয়া

বয়স ৪-৫ বছর

  • বয়স ২-৩ বছরের সব কাজ
  • নিজের বিছানা ঠিকঠাক করা
  • খাওয়ার পর নিজের টেবিল পরিস্কার করা
  • নিজের খাবার নিজে নিয়ে খাওয়া
  • বাড়ীর পোষা জীবজন্তু কে খেতে দেয়া
  • বাজার করার সময় কম ওজনের ব্যাগ বহন করতে দেয়া
  • নিজের প্লেট, চামচ খাওয়ার পর পানি দিয়ে ধোয়ে রাখা

বয়স ৬-৭ বছর

  • বয়স ৪-৫ বছরের সব কাজ
  • নিজের কাপড় নিজে ধুতে শুরু করা
  • ঘর ঝাড়ু দেয়া
  • নিজের ঘর গুছিয়ে রাখা

কাজগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপনঃ

আপনার সন্তানের বয়স বুঝে ঘরের যে কাজগুলো করাবেন তা নির্ধারণ করুন। কারণ আপনার লক্ষ্য হচ্ছে, ঘরের কাজগুলো করানোর মাধ্যমে তাকে তার উপর বিশ্বাস আনার সুযোগ করে দেওয়া। তাই কঠিন কাজ দিয়ে তাকে প্রথমেই বিচলিত করা ঠিক হবে না। সহজ ও নিরাপদ কাজগুলো তাকে করতে দিন।

দিনে ২-৩ টা কাজ করতে শেখান। সকালে তাকে বিছানা গোছাতে বলুন আর বিকালে গাছে পানি দিতে বলুন। মাঝে মাঝে রুটিনটা একটু উল্টো করে, সকালের কাজ বিকালে আর বিকালের কাজ বিকালের কাজ সকালে করতে বলুন। এতে করে তাকে কোন দিন কাজটা করার কথা না বলা হলেও সে নিজে নিজে করে নিতে শিখবে।

আত্ম-নিয়ন্ত্রণঃ

বাচ্চাদের দায়িত্ব দেওয়ার আরেকটা মানে হচ্ছে, তাকে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেওয়া। অনেক কাজ করার ইচ্ছা না থাকলেও, আমাদের কিন্তু কাজটা করতে হয়। জীবনের নিয়মটাই এমন। বাচ্চাদের যখন ঘরের কাজ শেখাবেন তখন সেও আস্তে আস্তে এটা বুঝতে শিখবে যে- কাজ করতে ইচ্ছা না করলেও টা করাটা জরুরী।

বাচ্চারা সবসময় সব কাজ করতে চাইবে না বা কোন একটা কাজ করতে করতে তার একঘেয়ে লাগতে পারে। হাল ছাড়বেন না। বা তার হয়ে কাজটা করে দেবেন না। মনে রাখবেন, আপনি করে দিলে সে ভাববে তার করতে ইচ্ছা না করলে আপনি কাজ টা করে দেবেন। এতে সে আত্ম-নিয়ন্ত্রনের শিক্ষা পাবে না। পরবর্তী জীবনে কঠিন কাজের পিছনে লেগে থেকে করায় অনুপ্রেরণা পাবে।

উৎসাহ এবং মূল্যায়নঃ

ঘরের কাজ করতে শেখা বাচ্চাদের মধ্যে লক্ষ্য ও নিজস্বতার জন্ম দেয়। তারা বুঝতে শিখে পরিবারে তাদের একটা ভূমিকা আছে। অনেকটা আপনার অফিসের টীমওয়ার্ক করার মতো। আপনি যেমন আপনার কাজকে পুরস্কৃত করা হলে আরো উৎসাহ পান ভালো পারফর্ম করার, বাচ্চাদের ব্যাপারটাও একই রকম।

তাই তাকে বুঝতে দিন যে সে ভালো কাজ করছে। তাকে আপনি যতই মূল্যায়ন করবেন সে ততই নতুন কিছু শিখতে ও করতে আগ্রহী হয়ে উঠবে। নিচের কথাগুলো বলে আপনি তাকে উৎসাহ দিতে পারেন-

  • খুব ভালো করেছো/ খুব সুন্দর হয়েছে
  • আমাকে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ
  • কাজটা করা সহজ ছিল না, তাও কত সুন্দর করে তুমি কাজটা শেষ করলে
  • তুমি বাসার কাজে আমাদের অনেক সাহায্য কর
  • তোমাকে নিয়ে আমি খুব খুশী

আরেকটা কাজ যেটা করতে পারেন, সেটা হল তাকে তার ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত করা। খেলনা ঠিকঠাক ভাবে গুছিয়ে রাখলে তাকে আদর করে দিন বা তার পছন্দের খাবার খেতে দিন। কখনও কোন বড়সড় ভালো কাজ করলে, তাকে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যান। আর তাকে অবশ্যই বলুন এটা তার ভালো কাজের পুরষ্কার।

Sharing is caring!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *